নিফাক অর্থ কি ? বিস্তারিত জেনে নিন

নিফাক (আরবি: نفاق) শব্দটির মূল অর্থ হলো দ্বিমুখীতা বা মুনাফিকি। এটি ইসলামী পরিভাষায় এমন একটি আচরণ বা অবস্থা বোঝায় যেখানে একজন ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে কিন্তু তার অন্তরে ঈমানের অভাব থাকে। নিফাক শব্দটি পবিত্র কুরআন এবং হাদিসে বহুবার উল্লেখিত হয়েছে, যা মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য এবং তাদের কর্মের পরিণতি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।

নিফাকের ধরন:

নিফাককে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

  1. আকিদাগত নিফাক (নিফাক ফি ইল-ইমান):
    • এটি হলো ঈমানের ক্ষেত্রে মুনাফিকি।
    • একজন ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে ঈমানদার সেজে থাকে, কিন্তু তার অন্তরে ইসলাম, আল্লাহ, ও রাসুলের প্রতি সত্যিকারের বিশ্বাস থাকে না।
    • পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:

      “মুনাফিকরা আল্লাহ ও ঈমানদারদের ধোঁকা দিতে চায়, অথচ তারা নিজেদেরই ধোঁকা দেয়।” (সুরা আল-বাকারা, ২:৯)

  2. কর্মগত নিফাক (নিফাক ফি ইল-আমাল):
    • এটি হলো কর্মের ক্ষেত্রে মুনাফিকি।
    • ব্যক্তি ঈমানদার হলেও তার কাজকর্মে মুনাফিকদের আচরণের মতো গুণাবলী প্রকাশ পায়।
    • রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

      “মুনাফিকের তিনটি লক্ষণ: কথা বললে মিথ্যা বলে, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখলে খেয়ানত করে।” (সহীহ বুখারি ও মুসলিম)

নিফাকের বৈশিষ্ট্য:

নিফাকের কিছু বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:

  1. মিথ্যাচার: সত্য গোপন করা এবং মিথ্যা প্রচার করা।
  2. প্রতারণা: মানুষকে ধোঁকা দিয়ে তাদের বিশ্বাস অর্জন করার চেষ্টা।
  3. অঙ্গীকার ভঙ্গ: প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করা।
  4. অমানতদারিতা: কারো আমানত বা বিশ্বাসের প্রতি খেয়ানত করা।
  5. রিয়াকারি (প্রদর্শনবাদ): শুধুমাত্র মানুষের কাছে ভালো সাজার জন্য আমল করা।
  6. ইসলামের প্রতি অবজ্ঞা: বাহ্যিকভাবে ইসলাম পালন করলেও অন্তরে এর প্রতি বিশ্বাস না থাকা।
আরো জানুন >>  গ্রাজুয়েট এবং পোস্ট গ্রাজুয়েট এর মধ্যে পার্থক্য কি ?

নিফাকের পরিণতি:

পবিত্র কুরআন এবং হাদিসে নিফাকের পরিণতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

  • নরকের নিম্নতম স্তরে অবস্থান:

    “নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে।” (সুরা আন-নিসা, ৪:১৪৫)

  • আল্লাহর অভিশাপ:

    “মুনাফিকরা আল্লাহর অভিশাপপ্রাপ্ত।” (সুরা আত-তাওবা, ৯:৬৮)

  • দুনিয়াতেও লাঞ্ছনা:

    “তারা আল্লাহ ও মুমিনদের ধোঁকা দিতে চায়, অথচ নিজেদেরই ধোঁকা দেয়।” (সুরা আল-বাকারা, ২:৯)

নিফাক থেকে বাঁচার উপায়:

নিফাক থেকে বাঁচার জন্য কিছু করণীয়:

  1. খাঁটি ঈমান রাখা: আল্লাহর প্রতি এবং ইসলামের মূলনীতি অনুসারে পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা।
  2. মিথ্যাচার ত্যাগ করা: সব ধরনের মিথ্যা ও প্রতারণা থেকে দূরে থাকা।
  3. সততা অবলম্বন করা: প্রতিটি কাজে আন্তরিকতা বজায় রাখা।
  4. সৎ সঙ্গ গ্রহণ করা: মুমিনদের সাথে সময় কাটানো এবং তাদের কাছ থেকে ভালো গুণাবলী অর্জন করা।
  5. আল্লাহর প্রতি ভয়: সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করা এবং তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করা।
  6. কুরআন ও হাদিসের চর্চা: পবিত্র কুরআন ও রাসুলের (সা.) বাণী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।

উপসংহার:

নিফাক ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয় একটি গুণ। এটি একজন মানুষের ঈমান ও চরিত্রকে ধ্বংস করে দেয় এবং তাকে আল্লাহর কাছে ঘৃণিত করে তোলে। মুমিন হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো নিফাক থেকে মুক্ত থেকে আল্লাহর প্রতি খাঁটি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে চলা। নিফাক মুক্ত জীবনই পরকালীন সফলতার চাবিকাঠি।

Leave a Comment