অনু ও পরমাণুর মধ্যে পার্থক্য কি

বিজ্ঞান বিশেষ করে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে অনু (Molecule) ও পরমাণু (Atom) দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এই দুটি ধারণা একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হলেও তাদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পরমাণু হলো পদার্থের ক্ষুদ্রতম একক, যা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে। অন্যদিকে, অনু হলো দুটি বা তার বেশি পরমাণুর সংযুক্তি, যা রাসায়নিক বন্ধনের মাধ্যমে গঠিত হয়। অনু ও পরমাণুর পার্থক্য বোঝার জন্য তাদের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, গঠন ও কার্যাবলি বিশদভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন।

পরমাণু কী ?

পরমাণু হলো পদার্থের ক্ষুদ্রতম একক, যা রাসায়নিকভাবে অপরিবর্তনীয় এবং মৌলিক কণাগুলোর দ্বারা গঠিত। প্রতিটি পরমাণু প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রন দ্বারা গঠিত হয়।

পরমাণু.

https://www.sciencefacts.net/wp-content/uploads/2020/11/Atomic-Structure-300x247.jpg
https://www.studygate.com/blog/wp-content/uploads/2017/12/understanding-atom-structure-nucleus-protons-electrons-neutrons.png
https://media.sciencephoto.com/image/f0113089/800wm/F0113089-Atomic_model%2C_illustration.jpg

পরমাণু হলো কোনো মৌলের সবচেয়ে ছোট কণা, যা সেই মৌলের সব রাসায়নিক ধর্ম বজায় রাখে।

সহজভাবে বোঝা যাক

  • পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস

    • এতে থাকে প্রোটন (ধনাত্মক চার্জ)

    • এবং নিউট্রন (চার্জ নেই)

  • নিউক্লিয়াসের চারদিকে ইলেকট্রন (ঋণাত্মক চার্জ) ঘুরে বেড়ায়

উদাহরণ

  • পানি (H₂O) তৈরি হয় হাইড্রোজেনঅক্সিজেন—এই দুই মৌলের পরমাণু দিয়ে।

  • সোনা, লোহা, অক্সিজেন—প্রতিটি মৌলের নিজস্ব পরমাণু আছে।

পরমাণুর গঠন:

  1. নিউক্লিয়াস (Nucleus): পরমাণুর কেন্দ্রস্থলে নিউক্লিয়াস থাকে, যেখানে প্রোটন (ধনাত্মক চার্জযুক্ত কণা) ও নিউট্রন (আনচার্জড কণা) থাকে।
  2. ইলেকট্রন মেঘ (Electron Cloud): নিউক্লিয়াসের চারপাশে ইলেকট্রন (ঋণাত্মক চার্জযুক্ত কণা) এক বা একাধিক কক্ষে ঘূর্ণায়মান থাকে।
  3. পরমাণুর চার্জ: পরমাণু সাধারণত বৈদ্যুতিকভাবে নিরপেক্ষ হয়, কারণ এতে প্রোটন ও ইলেকট্রনের সংখ্যা সমান থাকে।
আরো জানুন >>  দাওরা পাশ মানে কি

পরমাণুর বৈশিষ্ট্য:

  • পরমাণু মৌলিক কণা দ্বারা গঠিত।
  • এটি রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে।
  • একক পরমাণু পৃথকভাবে অবস্থান করতে পারে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরমাণুগুলো একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে অনু গঠন করে।
  • পরমাণুর ভর ও আকার বিভিন্ন মৌলিক উপাদানের জন্য পৃথক হয়।

অনু কী ?

অনু হলো দুটি বা তার বেশি পরমাণুর রাসায়নিক বন্ধনের মাধ্যমে গঠিত একটি একক। অনু স্বাধীনভাবে অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম এবং এর রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তনীয় থাকে।

অনু .

https://electraschematics.com/wp-content/img/dna_molecule_labeled_diagram_qtn.jpg
https://cdn2.vectorstock.com/i/1000x1000/92/26/h2o-water-molecule-model-chemical-formula-vector-41369226.jpg
https://image3.slideserve.com/6897340/atom-vs-molecule-l.jpg

অনু হলো দুই বা ততোধিক পরমাণু রাসায়নিক বন্ধনে যুক্ত হয়ে তৈরি হওয়া সবচেয়ে ছোট কণা, যা কোনো পদার্থের স্বতন্ত্র গুণাগুণ বজায় রাখে।

সহজভাবে বোঝা যাক

  • পরমাণু → একক কণা

  • অনু → একাধিক পরমাণুর সমষ্টি

উদাহরণ

  • পানি (H₂O) → ২টি হাইড্রোজেন + ১টি অক্সিজেন = ১টি অনু

  • অক্সিজেন গ্যাস (O₂) → ২টি অক্সিজেন পরমাণু = ১টি অনু

  • কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) → ১টি কার্বন + ২টি অক্সিজেন = ১টি অনু

মনে রাখার সহজ কৌশল

পরমাণু মিলেই অনু তৈরি হয়।

অনুর গঠন:

  1. সমযোজী বন্ধন (Covalent Bond): অধিকাংশ অনু সমযোজী বন্ধনের মাধ্যমে গঠিত হয়, যেখানে পরমাণুগুলো তাদের ইলেকট্রন ভাগ করে নেয়।
  2. আয়নীয় বন্ধন (Ionic Bond): কিছু অনু আয়নীয় বন্ধনের মাধ্যমে গঠিত হয়, যেখানে এক পরমাণু অন্য পরমাণুকে ইলেকট্রন দিয়ে দেয় বা গ্রহণ করে।
  3. অনুর স্থায়িত্ব: অনু সাধারণত স্থায়ী হয় এবং এটি রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে।

অনুর বৈশিষ্ট্য:

  • এটি একাধিক পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত হয়।
  • অনুর রাসায়নিক গঠন নির্দিষ্ট থাকে এবং এটি পরিবর্তন না হলে স্থায়ী থাকে।
  • প্রতিটি অনুর একটি নির্দিষ্ট আণবিক গঠন থাকে, যা তার বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে।
  • অনু রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে এবং নতুন যৌগ তৈরি করতে পারে।
আরো জানুন >>  উকিল ও ব্যারিস্টার এর মধ্যে পার্থক্য কি ?

চাঁদকে নিয়ে উক্তি

পরমাণু ও অনুর মধ্যে পার্থক্য:

অনু ও পরমাণুর মধ্যে বিভিন্ন মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, যা নিচের ছকে তুলে ধরা হলো:

বিষয় পরমাণু অনু
সংজ্ঞা পরমাণু হলো পদার্থের ক্ষুদ্রতম একক, যা রাসায়নিকভাবে অপরিবর্তনীয় অনু হলো দুটি বা তার বেশি পরমাণুর রাসায়নিক বন্ধনের মাধ্যমে গঠিত একটি একক
গঠন পরমাণু প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রন দ্বারা গঠিত অনু এক বা একাধিক পরমাণুর সংমিশ্রণে গঠিত
স্বতন্ত্র অস্তিত্ব পরমাণু সাধারণত একা থাকতে পারে, তবে অনেক ক্ষেত্রে অনু গঠনের জন্য একত্রিত হয় অনু স্বাধীনভাবে অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে এবং নির্দিষ্ট রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে
রাসায়নিক বন্ধন পরমাণুর মধ্যে রাসায়নিক বন্ধন থাকতে পারে বা নাও থাকতে পারে অনু রাসায়নিক বন্ধনের মাধ্যমে গঠিত হয়
উদাহরণ হাইড্রোজেন (H), অক্সিজেন (O), কার্বন (C) ইত্যাদি পানি (H₂O), অক্সিজেন গ্যাস (O₂), কার্বন ডাই অক্সাইড (CO₂) ইত্যাদি

পরমাণু ও অনুর সম্পর্ক:

অনু ও পরমাণু একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত, কারণ পরমাণু ছাড়াই অনুর অস্তিত্ব সম্ভব নয়। পরমাণুর পারস্পরিক সংযুক্তির মাধ্যমেই অনু গঠিত হয়। যেমন, দুটি হাইড্রোজেন (H) পরমাণু ও একটি অক্সিজেন (O) পরমাণু একত্রে যুক্ত হয়ে পানি (H₂O) অনু তৈরি করে।

  1. পরমাণু থেকে অনু গঠন:
    • হাইড্রোজেন পরমাণু + অক্সিজেন পরমাণু → পানি অনু (H₂O)
    • কার্বন পরমাণু + অক্সিজেন পরমাণু → কার্বন ডাই অক্সাইড অনু (CO₂)
  2. অনুর মধ্যে রাসায়নিক গঠন:
    • অনুতে পরমাণুদের সংখ্যা নির্দিষ্ট থাকে এবং এটি রাসায়নিকভাবে স্থিতিশীল থাকে।
    • কিছু অনু একজাতীয় পরমাণুর সংমিশ্রণে গঠিত হয় (যেমন, O₂, N₂), আবার কিছু অনু বিভিন্ন পরমাণুর সংমিশ্রণে গঠিত হয় (যেমন, H₂O, CO₂)।
আরো জানুন >>  মুবাহ অর্থ কি

উপসংহার:

পরমাণু ও অনু বিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপাদান, যা পদার্থের গঠন ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার ভিত্তি গঠন করে। পরমাণু হলো ক্ষুদ্রতম রাসায়নিক একক, যা মৌল গঠনের জন্য প্রয়োজনীয়, আর অনু হলো একাধিক পরমাণুর সংমিশ্রণে গঠিত একটি রাসায়নিক একক।

পরমাণু ও অনুর পার্থক্য বোঝা শুধু রসায়নের ক্ষেত্রেই নয়, জীববিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রকৌশলবিদ্যার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর সব পদার্থ পরমাণু দ্বারা গঠিত এবং এসব পরমাণু একত্রে যুক্ত হয়ে অনু তৈরি করে, যা আমাদের চারপাশের বস্তু ও জীবের অস্তিত্ব নিশ্চিত করে। সুতরাং, পরমাণু ও অনু উভয়ই বিজ্ঞানের মৌলিক ভিত্তি গঠনে অপরিহার্য।

Leave a Comment