ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় ধারণা হল “ওয়াকফ”। এই শব্দটি কেবল একটি আরবি শব্দই নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে মানবতার সেবা, দানশীলতা, ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ এবং সমাজের উন্নয়নের গভীর দর্শন। ইসলাম ধর্মে “ওয়াকফ” এমন এক ব্যবস্থা, যা ধর্মীয় ও সামাজিক কাজের জন্য সম্পদকে নিবেদিত করে দেয়া হয়। এই প্রবন্ধে আমরা “ওয়াকফ” শব্দের অর্থ, এর উৎস, ইসলামী বিধান, প্রকারভেদ এবং সামাজিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করব।
ওয়াকফ শব্দের অর্থ :
“وَقْف” (Waqf) শব্দটি আরবি ভাষার “وَقَفَ” (waqafa) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো “থামানো”, “বন্ধ করা”, বা “নির্দিষ্ট করা”। ইসলামী পরিভাষায় ওয়াকফ বলতে বোঝানো হয় – কোনো ব্যক্তির নিজস্ব সম্পত্তিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জনকল্যাণমূলক কাজে চিরতরে দান করে দেয়া, যাতে সেই সম্পত্তির মালিকানা আর কারো হাতে না থাকে এবং সেটি কেবল নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।
অর্থাৎ, ওয়াকফ এমন এক দান, যা একবার করা হলে তা ফেরত নেওয়া যায় না এবং এর দ্বারা স্থায়ীভাবে উপকার লাভ করে সমাজের সাধারণ মানুষ।
ইসলামী পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াকফ :
ইসলামের ইতিহাসে ওয়াকফের সূচনা হয়েছেন স্বয়ং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে। তিনি যখন একটি কূপ (Bir Rumah) কিনে মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করে দেন, সেটি ওয়াকফের প্রথম দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়। পরবর্তীতে সাহাবীগণও বিভিন্ন সম্পদ—মসজিদ, জমি, কূপ, গাছ, বাগান ইত্যাদি—ওয়াকফ করেন।
হাদীসে বর্ণিত আছে:
“যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ব্যতিক্রম ছাড়া: সদকা জারিয়া (চিরস্থায়ী দান), এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।” – (সহীহ মুসলিম)
এই “সদকা জারিয়া”-এর একটি বিশিষ্ট রূপ হলো ওয়াকফ।
ওয়াকফের প্রকারভেদ :
ওয়াকফ বিভিন্নভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়।
-
ধর্মীয় ওয়াকফ (Religious Waqf):
যেমন—মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, কূপ ইত্যাদি, যা শুধুমাত্র ধর্মীয় কার্যাবলির জন্য ব্যবহৃত হয়। -
সামাজিক ওয়াকফ (Charitable or Philanthropic Waqf):
যেমন—বিদ্যালয়, হাসপাতাল, এতিমখানা, রাস্তা, সেতু ইত্যাদি, যা সাধারণ জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।. উদ্দেশ্য অনুযায়ী
ক. ওয়াকফে খায়রি (خيری)
সাধারণ কল্যাণের জন্য করা ওয়াকফ।
উদাহরণ: মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, এতিমখানা, হাসপাতাল।খ. ওয়াকফে আহলি / যুররি (أهلي / ذري)
পরিবার বা বংশধরদের কল্যাণের জন্য করা ওয়াকফ।
উদাহরণ: আয়ের একটি অংশ সন্তানদের ভরণপোষণে ব্যয়।গ. ওয়াকফে মুশতারক (مشترك)
খায়রি ও আহলি—উভয় উদ্দেশ্য মিলিয়ে করা ওয়াকফ।
উদাহরণ: আয়ের একাংশ পরিবারে, একাংশ জনকল্যাণে।. সম্পত্তির প্রকৃতি অনুযায়ী
ক. ওয়াকফে স্থাবর (غير منقول)
অস্থাবর নয়—স্থায়ী সম্পত্তি।
উদাহরণ: জমি, বাড়ি, দোকান।খ. ওয়াকফে অস্থাবর (منقول)
চলমান বা অস্থাবর সম্পত্তি।
উদাহরণ: বই, অর্থ, গবাদি পশু (কিছু ফিকহি মত অনুযায়ী)।. কার্যকারিতা অনুযায়ী
ক. ওয়াকফে সহীহ (صحيح)
শরিয়তসম্মত ও পূর্ণাঙ্গভাবে বৈধ ওয়াকফ।খ. ওয়াকফে গায়র সহীহ (غير صحيح)
শরিয়তের শর্ত পূরণ না হওয়ায় অবৈধ বা অসম্পূর্ণ ওয়াকফ।
এছাড়াও ব্যক্তিগত পর্যায়েও কেউ ওয়াকফ করতে পারে, যেমন: পরিবারের সদস্যদের জন্য সম্পদ রেখে যাওয়া যাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম উপকৃত হয়, তবে এটি নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষ।
ওয়াকফের সামাজিক গুরুত্ব:
ওয়াকফ কেবল একটি ধর্মীয় দান নয়, বরং একটি সামাজিক পদ্ধতিও। এটি ধনী-গরিব বৈষম্য কমাতে সাহায্য করে। একজন ধনী ব্যক্তি তার সম্পদ থেকে একটি অংশ ওয়াকফ করে দিলে তা দিয়ে সমাজের অসহায় মানুষ উপকৃত হয়।
য়াকফের সামাজিক গুরুত্ব ইসলামী সমাজব্যবস্থায় অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। সংক্ষেপে ও পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলো—
১. দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক নিরাপত্তা
ওয়াকফের আয় দরিদ্র, এতিম, বিধবা ও অসহায় মানুষের জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করে। ফলে সমাজে দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমে।
২. শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা
মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, লাইব্রেরি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়াকফের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এতে জ্ঞানচর্চা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন ঘটে।
৩. স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ
ওয়াকফভিত্তিক হাসপাতাল, দাতব্য চিকিৎসালয় ও ঔষধ বিতরণ কেন্দ্র গড়ে উঠে, যা গরিব মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করে।
৪. ধর্মীয় ও নৈতিক উন্নয়ন
মসজিদ, ঈদগাহ, খানকাহ ইত্যাদি ওয়াকফের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে।
৫. সামাজিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি
ধনী-গরিবের মধ্যে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনের মাধ্যমে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি পায়।
৬. স্থায়ী দান ও সদকায়ে জারিয়া
ওয়াকফ একটি স্থায়ী দানের ব্যবস্থা—এর সওয়াব দীর্ঘদিন ধরে সমাজ ও দাতার জন্য অব্যাহত থাকে।
৭. রাষ্ট্রের ওপর চাপ কমানো
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণে ওয়াকফ ভূমিকা রাখায় সরকারের ব্যয় ও দায়িত্ব অনেকাংশে হ্রাস পায়।
৮. কর্মসংস্থান সৃষ্টি
ওয়াকফ সম্পত্তি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের অনেক বড় বড় মসজিদ, মাদ্রাসা, দাতব্য হাসপাতাল, এতিমখানা ইত্যাদি ওয়াকফ সম্পত্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। এটি সরকারের ওপর থেকে সামাজিক কল্যাণমূলক কাজের একটা অংশ হালকা করে দেয় এবং সমাজে সমবায়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলে।
ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা :
ওয়াকফ একটি নির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে পরিচালিত হয়। ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, ওয়াকফের জন্য একজন মুতাওয়াল্লি (ব্যবস্থাপক) নিয়োজিত করা হয়, যিনি ওয়াকফ সম্পত্তির দেখভাল করেন এবং নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে এর ব্যবহার নিশ্চিত করেন।
বাংলাদেশে ওয়াকফ প্রশাসনের জন্য সরকার ওয়াকফ প্রশাসন আইন প্রণয়ন করেছে এবং একটি আলাদা ওয়াকফ প্রশাসন বোর্ড রয়েছে, যা এসব সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার কাজ করে।
উপসংহার :
ওয়াকফ হলো এক মহান ইসলামী সমাজকল্যাণমূলক ধারণা, যা আত্মিক উন্নতি, দুনিয়াবি কল্যাণ ও পরকালের সওয়াব অর্জনের একটি সেতুবন্ধন। এর মাধ্যমে ব্যক্তি তার সম্পদকে আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করে সমাজের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পান। এক কথায়, ওয়াকফ শুধু দান নয়, বরং এটি মানবতার সেবা, নৈতিক দায়িত্ব ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য পথ।