“প্রতিবেশী” — শব্দটি আমাদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত একটি মানবিক সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি। “প্রতিবেশী” বলতে বোঝায় আমাদের আশপাশে বসবাসকারী মানুষ, যাদের সঙ্গে আমাদের নিত্যদিনের দেখা-সাক্ষাৎ, মেলামেশা, সহযোগিতা ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শুধুমাত্র পাশের বাড়ির বাসিন্দা হিসেবেই নয়, প্রতিবেশী হল সেই ব্যক্তি যিনি আমাদের দুঃখ-সুখে পাশে থাকেন, বিপদে-আপদে সহায়তা করেন এবং সমাজ গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠেন।
প্রতিবেশী শব্দের অর্থ :
বাংলা ভাষায় “প্রতি” অর্থ “কাছে” বা “সামনে”, এবং “বেশী” অর্থ “বসবাসকারী”। সুতরাং প্রতিবেশী মানে হলো—যে ব্যক্তি বা পরিবার আমাদের আশেপাশে, বিশেষ করে পাশে বসবাস করেন। ইংরেজিতে একে বলা হয় “Neighbor”। তবে এর তাৎপর্য শুধুমাত্র ভৌগোলিক সান্নিধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর মাঝে নিহিত রয়েছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহানুভূতি, এবং মানবিক বন্ধনের গভীরতা।
প্রতিবেশীর গুরুত্ব:
মানব সমাজ একটি মিলিত ও সহযোগিতাপূর্ণ কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে। এই কাঠামোর মৌলিক ভিত্তি হলো পারস্পরিক সহযোগিতা, যা প্রতিবেশীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। আমাদের পরিবার ছাড়া সবচেয়ে কাছের এবং প্রয়োজনের সময় যে মানুষটি আগে এগিয়ে আসে, তিনি হচ্ছেন প্রতিবেশী। হঠাৎ অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিবেশীর সাহায্য অনেক সময় জীবন রক্ষা করতে পারে।
প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক:
একজন ভালো প্রতিবেশী হলে জীবন অনেক সহজ ও সুন্দর হয়ে ওঠে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা আমাদের সামাজিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। প্রতিদিনের ছোট ছোট কথাবার্তা, সহযোগিতার মনোভাব, সম্মান প্রদর্শন, এবং মিলে মিশে চলার মধ্য দিয়ে এক শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন সৃষ্টি হয়। শিশুরা প্রতিবেশীদের সঙ্গে খেলাধুলা করে সামাজিক দক্ষতা শেখে, আবার বয়স্ক ব্যক্তিরা প্রতিবেশীদের সঙ্গে আলাপ করে মানসিক স্বস্তি পান।
ইসলামে প্রতিবেশীর গুরুত্ব :
ইসলাম ধর্মে প্রতিবেশীর অধিকার নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীর উপকার করে না, সে পরিপূর্ণ ঈমানদার নয়।” ইসলাম ধর্মে প্রতিবেশীর ক্ষতি করা মহাপাপ বলে গণ্য করা হয়। শুধু মুসলমান প্রতিবেশী নয়, অমুসলিম প্রতিবেশীর প্রতিও সদাচরণ ও সহযোগিতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে সামাজিক সম্পর্কের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রতিবেশীর অধিকার ও মর্যাদা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত।
১. কুরআনের নির্দেশনা: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর… এবং সদ্ব্যবহার কর পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, ইয়াতিম, মিসকিন ও নিকটবর্তী প্রতিবেশী এবং দূরবর্তী প্রতিবেশীর সঙ্গে।”
(সূরা আন-নিসা: ৩৬)
২. হাদিসে প্রতিবেশীর অধিকার: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“জিবরাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিয়েছেন যে, আমার মনে হতে লাগল, তিনি হয়তো তাকে উত্তরাধিকারী করে দেবেন।”
(সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
৩. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া নিষিদ্ধ: ইসলামে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়াকে ঈমানের পরিপন্থী বলা হয়েছে। নবী ﷺ বলেন,
“আল্লাহর কসম! সে মুমিন নয়—যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।”
(সহিহ বুখারি)
৪. সহানুভূতি ও সাহায্য: ক্ষুধার্ত অবস্থায় প্রতিবেশী থাকলে নিজে তৃপ্ত থাকা ইসলাম সমর্থন করে না। প্রতিবেশীর দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়ানো ঈমানের অংশ।
৫. মুসলিম ও অমুসলিম প্রতিবেশী: ইসলামে শুধু মুসলিম নয়, অমুসলিম প্রতিবেশীর প্রতিও সদ্ব্যবহার ও ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ রয়েছে।
আজকের সমাজ ও প্রতিবেশী সম্পর্ক:
বর্তমান ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে অনেক সময় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়ছে। আমরা অনেকেই জানিই না আমাদের পাশের ফ্ল্যাট বা বাড়িতে কে থাকেন। এটা একটি দুঃখজনক বাস্তবতা। তবে এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত প্রতিবেশীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, তাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং একে অপরের ভালো-মন্দে অংশগ্রহণ করা।
আধুনিক সমাজে প্রযুক্তি ও ব্যস্ত জীবনযাত্রার প্রভাবে মানুষের জীবনযাপন অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী সম্পর্কের ওপর।
১. ব্যস্ততা ও দূরত্ব: কর্মব্যস্ততা, পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত কাজে মানুষ এতটাই ব্যস্ত যে অনেক সময় পাশের বাড়ির মানুষের খোঁজ নেওয়ার সুযোগও হয় না। ফলে আগের মতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে না।
২. প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে দূরের মানুষের সঙ্গে যুক্ত করলেও কাছের প্রতিবেশীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছে। মুখোমুখি কথোপকথনের বদলে ভার্চুয়াল সম্পর্ক বাড়ছে।
৩. নগরায়ণ ও ফ্ল্যাট সংস্কৃতি: গ্রাম থেকে শহরে আসা ও ফ্ল্যাটভিত্তিক বসবাসের কারণে মানুষ একই ছাদের নিচে থেকেও একে অপরকে ঠিকভাবে চেনে না। এতে আত্মীয়তা ও সৌহার্দ্য হ্রাস পাচ্ছে।
৪. তবুও প্রয়োজনীয়তা অপরিবর্তিত: পরিবর্তন সত্ত্বেও বিপদে-আপদে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বা জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিবেশীর গুরুত্ব আজও অপরিসীম। তখনই বোঝা যায় কাছের মানুষের মূল্য।
৫. সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়োজন: আজকের সমাজে প্রতিবেশী সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সচেতন উদ্যোগ দরকার—সৌজন্যমূলক আচরণ, শুভেচ্ছা বিনিময়, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ইত্যাদি সম্পর্ক দৃঢ় করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, আধুনিকতার চাপে প্রতিবেশী সম্পর্ক দুর্বল হলেও মানবিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই সম্পর্ককে আবারও শক্তিশালী করা সম্ভব।
BBC
উপসংহার :
প্রতিবেশী শুধু একটি সামাজিক পরিচিতি নয়, এটি মানবিকতার এক উজ্জ্বল রূপ। একজন ভালো প্রতিবেশী যেমন আমাদের জীবনের আশীর্বাদ, তেমনি একজন অসৎ প্রতিবেশী হতে পারেন চরম দুর্ভোগের কারণ। তাই সমাজে শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে হলে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। আসুন আমরা সবাই ভালো প্রতিবেশী হই এবং আমাদের চারপাশকে আরও মানবিক ও বাসযোগ্য করে তুলি।